হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল।
কেবিন থেকে বের হয়ে দেখি লঞ্চ কেরানীগঞ্জ ঘাট দেওয়া।
এই লঞ্চগুলোর একটা অসুবিধা ডেকের যাত্রী নামানোর পর খালের অপর পাশে নিয়ে যায়। লঞ্চ থেকে নেমে নৌকায় উঠলাম। মাঝি অপেক্ষা করছে আরো এক দুইজন যাত্রীর আশায়।
সাদা পাঞ্জাবি পরা, ৪০ বছরের আশেপাশের একজন লোক আসছে। কাধে পোটলা টাইপের কিছু একটা, হাতে আরেকটা পোটলা আর তার পিছনে তার স্ত্রী, পরনে গায়ে হলুদের হলদে শাড়ি। শাড়ির হলদে রংটা রোদে পোড়ার কারণে হালকা সাদা রূপ ধারণ করেছে।
লোকটা দপ করে নৌকায় উঠে গেল। পোটলা দুইটা রেখে রাগান্বিত কণ্ঠে স্ত্রীকে ঢাকলো,
-'ওই মাগী, তাড়াতাড়ি আহস না ক্যা, তোর লইজ্ঞা কি হারাদিন এহানে অপেক্ষা করমু নাকি?'
স্ত্রীর মুচকি হাসতে হাসতে নৌকায় উঠে আসলো। ভাবে বোঝা গেল তার স্বামীর 'মাগী' ডাক শুনতে যে যথেষ্ট অভস্ত্য এবং স্বাচ্ছন্যবোধ করে।
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে পান ভরা গালে দাতখানা বের করে বিশ্রীভাবে হেসে দিল।
-' ভাইসাহেব কিছু মনে কইরেন না, ওরে আবার মাগী না ডাকলে শুনে না।'
নৌকা থেকে নেমে হাটতে হাটতে চলে আসলাম ভিক্টোরিয়া পার্ক।
পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা, রাতে কিছু খাওয়া হয়নি। পাশে একটা খোলা খাবারের দোকানে ঢুকলাম, পকেটে বেশি টাকা নেই কিন্তু ব্যাগের ভেতর অতিমূল্যবান একটা জিনিস রয়েছে।
পরোটা আর ডালভাজি খাচ্ছি। ব্যাগের দিকে তাকালাম, এইমূল্যবান জিনিসটা জন্য ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কেবিনে আসতে হয়েছে। একটা ডায়েরী মাত্র...
হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা ছোকরা আমার ডান পায়ের উপর ধপস করে পরলো, ছেলেটার বয়স ১৫ এর মত হবে, দেখেই বোঝা যায় ২/৩ দিন কিছু খায়নি..
-'ভাইজান, আমার অনেক খিদা লাগছে ভাইজান, আপনে আমারে খালি একখান রুটি খাওয়ান। টাকা দেওন লাগবো না, খালি একখান রুটি'
এমনেই পকেটে টাকা নাই তার উপর রাতে কিছু খাই নাই। মাথাটা গরম হয়ে গেল,
'কাম কইরা খাইতে পারোস না? যা ভাগ'
ঝটকা দিয়ে পা সরিয়ে নিয়ে আসলাম। ছেলেটা আবারো পা ধরতে যাবে এই মূহুর্তে দোকানদাকে ডাক দিলাম।
-' কি মিয়া, দোকানের মধ্যে বসে শান্তিতে খাইতেও পারি না। এদের কে কি ভাড়া করে দোকানের বাহিরে রেখে দেন নাকি?'
দোকানের মালিক মধ্যবয়সী, মাথায় চুল তেমন নেই, চেহারায় একপ্রকার রাগী রাগী ভাব সর্বদা বিরাজমান।
-' এই খানকির পো'রে কাল রাতে কইছি এখান থেকে ভাগতে। তোর কোন বাপ এখানে তোর লইজ্ঞা খাওন লইয়া বইয়া আছেরে মাংগারির পো! খানকির পো'রে লাত্থি মাইরা বাইর কইরা দে'
ছেলেটা উঠে চলে গেল। যাওগায় আগে দোকানের ঠিক কোণায় গিয়ে আমার চোখের দিকে তাকালো। তার চোখে ক্ষুদার সাথে এখন আমার প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা দেখতে পাচ্ছি। ছেলেটাকে দেখতে এখন আমার মৃত ভাই অভ্রের মত লাগছে…অভ্র মারা গেছে ৮ মাস হয়েছে।
পকেটে মাত্র ২০ টাকা আছে। এটা দিয়েই আমাকে এখন বারডেম এ যেতে হবে।
রওনা দিলাম শাহবাগের দিকে। গাড়িতে ভেতরের সীটে এক মেয়ের পাশে বসেছি। মেয়েটা বার বার আমার দিকে অসহ্যকর দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে আমার জন্যই উনি সামনেই কোথাও নেমে যাবে।
শাহবাগ নেমে মোবাইল থেকে টিপতে টিপতে একটু একটা নাম্বারে ডায়াল করলাম। অপর পাশের লোকটার বিনয়ের সাথে গেটে আমাকে অপেক্ষা করতে বললো, তিনি ২ মিনিটের ভেতরে আসছেন।
৪০ এর বেশি বয়সী লোক দৌড়াতে দৌড়াতে ছুটে আসছে। এসেই,
- 'ভাই এনেছেন জিনিসটা?'
- ' হ্যা, এনেছি। আগে আমার টাকাটা দিন।'
-' এখানে মোট ১০ হাজার আছে। এই নিন আরো ২ হাজার আপনার বকশিস। আপনি আমার যেই উপকার করলেন।'
আমি ভাবতেছি লোকটা একটা সাধারণ ডায়েরী জন্য আমাকে ১২ হাজার টাকা দিলো, কি আছে ঐ ডায়েরিতে? না……ব্যাপারটা দেখা লাগে! আমি ডায়েরিটা খুলে পড়েছিলাম, তেমন কিছুই নাই।
কতগুলো দিনের রুটিন, মাসিক খরচ, কিছু কবিতা আর একটা চিঠি।
বিরাট বড় একটা চিঠি...
চিঠি!
আমি দৌড় দিয়ে লোকটার পিছু নিলাম। লিফট ৮ তালায় উঠে যাচ্ছে, আমি লিফট ধরতে পারিনি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে লোকটাকে বার বার ফোন দিতে লাগলাম।
ধরেছেন...
- 'ভাই কই? আমি রুগী দেখতে চাই....'
- 'আপনি কই আছেন? চলে যান নাই?'
-' আমি ৮ তালায়, আপনার কেবিন ফ্লোরে'
-' আচ্ছা দাড়ান আমি আসছি....'
৫ মিনিটের মধ্যে লোকটা চলে এসেছে ,
-' যা বলবেন তাড়াতাড়ি বলেন। আমার আইসিইউ তে যাওয়া লাগবে'
-' ভাইজান একটা প্রশ্ন করি, আপনার মায়ের নাম কি?'
উত্তেজিত লোকটার হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।
লোকটার চোখের কোণায় জল জমা হয়ে যাচ্ছে।
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলছে,
- ‘ আপনি ডায়েরীর চিঠিটা পড়েছেন তাহলে!
আমার মা আমার বাবারে এই চিঠিটা দিয়েছিলো। আমি এখন পর্যন্ত আমার মায়ের পরিচয় জানি না। আমার বাবা এখন মৃত্যুসজ্জায়, আমাকে বললো গোপালপুর গ্রামে তাদের প্রথম প্রেম পত্র আছে। বললো ওটা নিয়ে আসতে। তাই আপনাকে দিয়ে এটা আনিয়েছি।’
বাকি কাহিনী আমি চিঠিতে পড়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু এটা যে এইভাবে ঘটে যাবে বুঝতে পারিনি। বিয়ের আগের শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন তারা। মেয়েটা সমাজের কাছ থেকে বাঁচাতে ৩ দিনের বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে কিভাবে পালিয়ে এসেছিলো এই ভদ্রলোকের বাবা।
আমি তাড়া দিলাম…
- ‘আপনি তাড়াতাড়ি গিয়ে আপনার মায়ের পরিচয় জেনে নিন।’
- ‘হ্যা, বাবার অবস্থা ভালো নেই। ডাক্তার বলেছেন বেশি সময় লাইফ সাপোর্ট এ থাকবেন না। আমি যাই। আপনাকে ধন্যবাদ’
তাড়াতাড়ি করে লোকটা আইসিইউ তে ঢুকে গেলেন। আমি নিচে নেমে আসলাম।
পকেটে মোট ১২ হাজার টাকা।
চলে আসলাম ভিক্টোরিয়া পার্কের সেই দোকানে।
সেই ছেলেটাকে দেখতে পেলাম না।
বাংলাবাজারের রাস্তায় হাঁটছি। অভ্রের একটা প্রিয় বই ছিল। বইটার নাম মনে করার চেষ্টা করলাম। ও এর আগেরবারের জন্মদিনে আমার কাছে ঐ বইটা চেয়েছিল। আমি ওকে বইটা দিতে পারিনি।
হ্যা মনে পড়েছে, ‘ গণিতের মজা মজার গণিত’ জাফর ইকবাল স্যারের বইটা। আমাকে এসে বলেছিলো, ‘দাদা আমার এক বন্ধু ‘ গণিতের মজা মজার গণিত’ বইটা ক্লাশে নিয়ে এসেছিল। গনিত যে এতো মজার আমি আগে বুঝতে পারিনি। আমার বইটা চাই। ওকে আমি বলেছিলাম ১ দিনের জন্য বইটা দিতে কিন্তু ও আমাকে দিবে না। তুমি প্লিজ আমাকে কিনে দিও’।
বাবা মারা যাওয়ার পর ওর সব আবদার আমাকেই করে। আমি তখন ওকে আশ্বাস দিয়েছিলাম কিনে দিবো, কিন্তু কিনে দিতে পারিনি...
বাংলাবাজার থেকে বইটা কিনে নিলাম।
চলে আসছি, এক কোণায় দেখলাম ঐ অভুক্ত জীর্ণ ছেলেটা তার ময়লা গেঞ্জির ফাঁক থেকে অল্প ছেঁড়া একটা রুটি খাচ্ছে। হাতে মুখে কুকুরের আঁচরের দাগ, রক্ত ঝড়ছে। হয়তো কুকুরের সাথে যুদ্ধ করে রুটি টুকু জোগাড় করতে পেরেছে… পরম মমতার সাথে রুটিটার অংশ মুখের ভিতরে নিচ্ছে…
ক্ষুধার এই পৃথিবীতে…সবাই ক্ষুধার্ত
কেউ হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে পাওয়ার, কেউ স্মৃতির, কেউ ভালোবাসার বা কেউ খাবারের…
পর্ব ০৫