আমার বন্ধু সৈকতকে বললাম,
“ভাই, তোদের সাথে ইংরেজী প্রাইভেট পড়তে চাই।”
সৈকত অন্যমনস্ক থেকে সিরিয়াস হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
“তুই না জামিল স্যারের কাছে পড়িস? উনি তো বরিশালের অন্যতম সেরা ইংরেজীর শিক্ষক। উনাকে রেখে তুই আমাদের কাছে? খবর কি রে?”
“লাবণ্যরে…”
লাবণ্যের নাম বলতেই আমার মুখ লাল আকার ধারণ করলো।
জীবনের প্রথম ভালোবাসা। আমি তখন সারাদিন লাবণ্যকে নিয়ে ভাবতাম। লাবণ্যের সাথে প্রথম দেখা সরস্বতী পুজায়।
মতিলাল দে কলেজে সরস্বতী পুজো হচ্ছে। আমি আগেই অঞ্জলী নিয়েছি তারপরও বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হবো তাই এখানে এসেছি।
প্রথম লাবণ্যকে দেখি সবুজ শাড়ী সাথে লাল ব্লাউজ পড়া অবস্থায়, যেন পুরো বাংলাদেশকে সে ধারণ করছে। আমি ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড দেশ প্রেমিক, তাই সবুজ আর লাল শাড়ী পড়া অবস্থায় দেখে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারিনি।
প্রকৃতপক্ষে, লাবণ্যের মত এতো মায়াবী মেয়ে আমি আবার জীবনে দেখিনি! ওর চোখ দুটো যেন পৃথিবীর দুই চুম্বকক্ষেত্র এবং আমাকে বার বার ওর দিকেই টানতেছিলো…
সবাইকে পুজোর প্রসাদ দেওয়া হচ্ছিলো আর আমি প্রসাদ না নিয়ে লাবণ্যের প্রসাদ খাওয়া দেখছিলাম। আহ! কি আলতো করে ও আপেলের টুকুরোটুকু মুখের মধ্যে নিল যেন আপলও ব্যাথা না পায়।
লাবণ্য হাসলে গালে টোল পড়ে। এই যেন টোল না, আমি এর নাম দিয়েছি “প্রেমফাঁদ”।
ঐদিনের পর থেকে আমার চিন্তা চেতনা শয়নে স্বপনে শুধু একজনই বিরাজ করছে।
“লাবণ্য!” “লাবণ্য!” “লাবণ্য!”
টানা ৫/৬ দিন খোঁজার পর লাবণ্যের ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট খুঁজে পাই। ও ফেসবুক চালায় না এই তথ্য আমাকে সৈকত দিয়েছিলো। ইনস্টাগ্রামে লাস্যময়ী হাসি দেওয়া একটা ছবি। ফলোয়ার ৫হাজারের ও বেশি। ফলোইং শূন্য।
মনে মনে ভাবলাম, এইসব মেয়ে আমাদের জন্য না। নিজের ইনস্টাগ্রাম প্রফাইলে ঢুকে হতাশ। ৩৫ জন ফলোয়ার আর ফলোইং ২ হাজারের মত। ভাবলাম, ব্যাপারটা বামুন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার মত।
তারপর আমি থেমে থাকলাম না। প্রতিদিন ইউটিউবে মোটিভেশনাল ভিডিও দেখা শুরু করে দিলাম। নিজের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত বাঘকে দেখতে পেলাম এইসব মোটিভেশনাল ভিডিও মাধ্যমে। আমি হয়ে গেলাম সালাউদ্দিন সুখনের ডাই হার্ড ফ্যান। এছাড়াও সার্চ দিতাম “মেয়ে পটানোর টিপস”, “মেয়ে পটানোর ১২ টি নিঞ্জা টেকনিক” আর সারাদিন ঐসব লেখা পড়তাম।
প্রতিদিন লাবণ্যের জন্য ওদের পাড়ার গলিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম। মেয়েটা প্রতিদিন রিক্সা দিয়ে এসে নামতো ওর বাসায় সামনে।
ওদের বাসার নাম “খাঁ ভিলা”।
খাঁয়ের উপর থেকে চন্দ্রবিন্দু উঠে যাওয়াতে এখন নাম “খা ভিলা”।
একদিন প্রচণ্ড সাহস নিয়ে পাঠিয়ে দিলাম লাবণ্যকে ফলোরিং। জানি আমাকে ফলোব্যাক করবে না, তারপরও…
এরপর যুক্ত হলাম সৈকতদের ইংরেজী প্রাইভেটে কারণ লাবণ্য ওখানে পড়ে।
প্রাইভেটে স্যার “subject verb agreement ” পড়াচ্ছে আর আমার চিন্তা “Dipraj Labbanya Agreement”। কিভাবে ওকে পটানো যায়…
একদিনের কাহিনী, স্যার মডেল টেষ্ট নিচ্ছে। প্রায় সবাই খাতা জমা দেওয়া শেষ। রুমে ৪ জন লোক। স্যার, আমি, আরেকটা মেয়ে আর লাবণ্য।
যদিও পরীক্ষার মাঝে আমি লাবণ্যের দিকে অনেকবার তাকিয়েছি তারপরও ভাব নিচ্ছি আমি ওকে কেয়ার করি না।
এক্সাম টাইম ওভার। স্যার সবার খাতা নিয়ে নিচ্ছে। আমি ব্যাগ গোচ্ছাচ্ছি আর তখন পিছন থেকে লাবণ্যের ডাক।
“হ্যালো দ্বীপ, তোমার কাছে আগের ক্লাশের নোটটা হবে?”
আমি মাথা ঘুরিয়ে রিতিমত অবাক। এই কি শুনছে আমার কান? এ কি আমি স্বপ্ন দেখছি নাকি বাস্তব?
আমার নাম কি “দ্বীপ” ? এমনও হতে পারে আমার নাম দ্বীপ না, মেয়েটা ভুলে আমাকে দ্বীপ নামে ডাকছে। নিজের নাম দ্বীপ নাকি এটা চেক করার জন্য খাতায় উপরে তাকালাম।
হ্যা, আমার নামই দ্বীপ। আমার মা বলেছে আমার পিসিমা নাকি আমার এই নাম দিয়েছিলো।
আমার মনে হচ্ছিলো আমার ঘাড়ের দিক থেকে একটা শীতল স্রোত আমার পিঠ বরাবর নেমে যাচ্ছে। হৃদস্পদন তখন তুঙ্গে।
ফুসফুস তখন বাতাস শুন্য। আমি কিছুটা বাতাস নিয়ে বললাম,
“হবে”।
কন্ঠটা ঝাপসা হয়ে গেছে।
“এখন কি খাতা আছে? তাহলে দেও, আমি একটু ছবি তুলে নি।”
এই প্রচন্ড আবেগের সময়েও আমরা ব্রেন কাজ করলো। মিথ্যা করে বললাম,
“ না এখন তো নেই। বাসায়। তুমি তোমার হোয়াটসএয়াপ নাম্বার দেও। আমি ছবি তুলে পাঠিয়ে দিবো”
“ আমার তো হোয়াটসঅ্যাপ খোলা নেই। আমি তোমাকে আমার জিমেইল দিচ্ছি। ওখানে পাঠিয়ে দিও”
মনে মনে ভাবলাম, ইস, মেয়েটাও চালাক। যাইহোক আপাদত জিমেইল দিয়েই কাজ চালাই….
এরপর থেকে জিমেইলে আমাদের কথা চলতে থাকতো।
ওকে আমি বোঝাতে চাচ্ছিলাম আমি ওকে ভালোবাসি কিন্তু ও কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতো। ভাবতাম, এইটুকু যে পেয়েছি, এটাই বা কম কিসের?
সৌকত আমার এইসব কাজে প্রচণ্ড সাহায্য করতো। প্রাইভেটে যাতে আমরা পাশাপাশি বসতে পারি তাই ও আগে এসে আমাদের জন্য সীট এরেঞ্জমেন্ট ওমন করে রাখতো। যদিও এই কাজের জন্য ওকে সিগারেট কিনে দেওয়া লাগতো।
একদিন প্রচন্ড সাহস নিয়ে মেইল করলাম, “দেখো লাবণ্য, তুমি হয়তো বুঝতে পেরেছো আমি কেন তোমাকে এতো মেইল করি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্রচন্ড ভালোবাসি”
কোন রিপ্লাই আসলো না…
পরেরদিন লাবণ্য প্রাইভেটে এসে আমার পাশে না বসে দূরে এক কোণায় গিয়ে বসলো। আমাকে প্রচণ্ড ইগ্নোর করা শুরু করে দিলো। আমিও হাল ছাড়ার পাত্র নই!
আমি হয়ে উঠলাম ভয়ংকর সাহসী এক ছেলে।
প্রতিদিন ওর বাসায় নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুরু করলাম। অনেক গুলো মেইল আইডি খুলে পাঠাতে শুরু করলাম, “আমি জানি তুমিও আমাকে ভালোবাসো।” তারপর কোন এক কবিতার ৪/৫ লাইন নিজের নাম করে চালিয়ে দিতাম।
এভাবেই চলতে থাকলো। প্রতিদিন ওদের গলি, বাসার আশেপাশে, প্রাইভেটে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কলেজ শেষে দাঁড়িয়ে থাকতাম…
আমি আর পারছি না…!
১৪ই ফ্রেবুয়ারির রাতে মেইল করলাম, “আজ হতে যাচ্ছে আমার জীবনের শেষ রাত। তুমি যদি আমাকে মেইল না করো আজই আমি ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করবো। সময় ১ ঘন্টা। যেই জীবনে লাবণ্য নেই সেই জীবন রেখে কি বা লাভ?”
আধ ঘন্টা পর মেইল আসলো, “আপনি কি পাগল? কেন এগুলো করছেন। আপনি বুঝেন না আমার যে আপনাকে ভালো লাগে না।”
মেয়েটা প্রথমবারের মত আমাকে “আপনি” বলে ডাকছে। কাহিনী কি ঘুরলো নাকি!!!?
আমি সাথে সাথে মেইল করলাম, “কেন ভালোলাগে না?”
রিপ্লাই আসলো,
“ভালো না লাগার কোন কারণ নেই। আমার ভালো লাগে না, মানে লাগে না”
আমি তারপরও হাল ছাড়লাম না। মনে শক্তি নিয়ে মেইল করলাম,
“কাল কি আমরা কলেজের পর কথা বলতে পারি?”
“বলা যেতে পারে। কিন্তু আপনি ভাববেন না যে আপনাকে বফ ভেবে কথা বলছি। আপনি পাগলামী করছেন এইকয়দিন ধরে তাই…”
পরেরদিন আমাদের সামনা সামনি কথা হলো। ওকে আমি আবারো প্রোপজ করে বসলাম।
“আপনি কি পাগল! সবার সামনে কেউ এইসব কথা বলে? শুনুন আমি আপনাকে ভালবাসি না। আর কখনো বাসবোও না। আমার আপনাকে পছন্দ না।”
মন খারাপ করে মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলাম,
“আচ্ছা শুনুন, কাল আমার একটু শপিং এ যেতে হবে। আপনি বিকালে সময় দিতে পারবেন?”
“অবশ্যই”
“শপিং এ যেতে বলেছি এটা ভাববেন না আপনি আমার বফ। আমার বান্ধবীরা সবাই ব্যস্ত তাই আরকি। একা একা শপিং করতে ভালো লাগে না।”
এরপর থেকে নিয়মিত আমাদের মধ্যে কথা হতো, রাতে মেইলিং হতো…
মাঝে মাঝে রাত ১২/১ টায় ওর বাসার নিচে ঘোরাফেরা করতাম। কেন জানি প্রচন্ড ভালো লাগতো।
“আপনি কি পাগল? এতো রাতে কেউ কারো বাসার নিচে ঘোরাফেরা করে? আপনি এখনোই বাসায় যান।”
“যাবো কিন্তু আগে বলো কাল একসাথে কফি খাবো?”
“আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু এটা ভাববেন না যে আপনাকে আমার বফ ভেবে এইসব করছি। আপনি পাগল মাথায়, কি না কি করে বসবেন তাই…”
মনে মনে ভাবলাম, এই মেয়ে জীবনে বলবে না যে আমাকে ভালোবাসে, বুদ্ধি করে ভালোবাসি কথা বের করতে হবে।
সৈকত, আমি আর লাবণ্যের কয়েকজন বন্ধু মিলে প্লান করলাম লাবণ্যের মুখ থেকে ভালোবাসি বের করার জন্য।
প্লানটা এভাবে করলাম যে “লাবণ্যের বান্ধবী রিতা লাবণ্যকে বলবে, "আমি ঐদিন দ্বীপকে দেখেছি একটা মেয়ের সাথে বেলস পার্কে ঘুরতে। মেয়েটা সাথে রিতিমত হেসে হেসে কথা বলছে, যেন ওর গফ।"
একদিন এর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য লাবণ্যের সামনে দিয়ে একটা মেয়েকে নিয়ে যাবো। আমি লাবণ্যকে খেয়াল করিনি এমন টাইপের ভাব নিবো।”
প্লান মোতাবেক কাজ হলো।
পরেরদিন লাবণ্য প্রাইভেট শেষে আমাকে টেনে কাঞ্চন পার্কে নিয়ে আসলো।
“আপনাকে ঐদিন একটা মেয়ে সাথে দেখেছি, কে মেয়েটা?”
“তাতে তোমার কি? তুমি তো আমাকে পছন্দ করো না। চাও যাতে তোমার থেকে দূরে দুরে থাকি। তার ব্যবস্থা করলাম আরকি”
“আপনি কি সত্যি সত্যি………ভেবে দেখেন, আমি চলে গেলে কিন্তু আমাকে আর পাবেন না। তখন পাগলামী করলেও হবে না।”
লাবণ্যে মুখ লাল হয়ে আসছে। চোখ জলের ছাপ…
“হ্যা। তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না। ভালোবাসলে অন্য ব্যাপার ছিল।”
অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো, “কে বলেছে আমি ভালোবাসি না?”
“তুমিই তো বলো… দাড়াও দাড়াও, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?”
মেয়েটা আর নিজেকে আঁটকে রাখতে পারলো না। কান্না করে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমার মনে হলো আমার জীবন সার্থক। এই অনুভূতি যেমন রবীন্দ্রনাথের অপরিচিতার “জায়গা আছে” বলা শব্দের মত। সত্যিই লাবণ্যের মনে আমার জন্য জায়গা আছে। টানা ১ বছর ৩ মাসে যুদ্ধের পর তাহাকে পাইলাম।
“আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি” কানতে কানতে লাবন্য বললো।
রাতেই লাবণ্য তার ৫০০০ প্লাস ফলোয়ার আইডি দিয়ে আমাকে ফলো করলো। মাত্র ১টা ফলোইং। সেটাও আমাকে। এখন আমাদের চ্যাট ইন্সট্রাগ্রামেই হয়।
বিঃদ্রঃ এই সুন্দর প্রেমের কাহিনীর শেষ এখানেই। যদি নিজেকে আত্মঘাতী হামলা করাতে মনে না চায় তাহলে শেষকথা অংশটুকু পড়বেন না, ভুলেও পড়বেন না।
শেষকথাঃ কেন জানি আমার আর এখন লাবণ্যকে ভালোলাগে না। এখন আমার ভালোলাগে লাবণ্যের বান্ধবী স্বর্ণাকে। স্বর্ণা মেয়েটা প্রাইভেটের স্যারের বার্থ ডে পার্টিতে সাদা শাড়ী আর লাল ব্লাউজ পড়ে এসেছিলো। যেন পুরো জাপানের মানচিত্রকে ধারণ করছে। ছোটবেলা থেকে আমার জাপানিজ এনিমের প্রতি বিশাল টান। সেখান থেকে জাপানের প্রতিও প্রবল টান রয়েছে। শাড়িতে মেয়েটাকে দেখেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। ইন্সট্রাগ্রামে এখন লাবণ্যের দেওয়া “আই লাভ ইউ ইনফিনিটি” মেসেজ ঘন্টার পর ঘন্টা আইসিন হয়ে পরে থাকে। আমি এখন ব্যস্ত থাকি স্বর্ণাকে ফেইক জিমেইল দিয়ে পটাতে। আমার ধারণা স্বর্ণা আমার জীবনের প্রথম প্রেম। স্বর্ণা ছাড়া আমার বাঁচা অসম্ভব।”
Click Here To Read Next Others.