ছোটবেলা থেকেই শপিংব্যাগের প্রতি তানভীরের তীব্র ভালোবাসা। এই তীব্র ভালোবাসার কারণ তানভীর জানে না। ওর শুধু মনে আছে ছোটবেলার একটা কাহিনী। ওর ৮তম জন্মদিনে পাশের বাসার রিনা আন্টি ওকে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি গিফট করেছিলো। রিনা আন্টির ছোট মেয়ে তুলি, তানভীরের সমবয়সী ।কেক কাঁটার পর মিষ্টি হাসি দিয়ে তানভীরের হাতে গিফট দিল। এই প্রথম তানভীরের প্রেমে পড়া। তুলির প্রতি না, যেই শপিং ব্যাগে করে গিফট দেওয়া হয়েছিলো ঐ ব্যাগের প্রতি।
ঐদিন রাতে সকল গিফট ফেলে রেখে তানভীর ঐ শপিং নিয়ে ঘুমতে গেল।
পরেরদিন স্কুলে দেখা গেল তানভীর তার বইয়ের ব্যাগ রেখে শপিংব্যাগে করে স্কুলের বই নিয়ে এসেছে । ক্লাশে আমরা ওর এই অবস্থা দেখে খানিকটা অভিভূত। ভাবলাম হয়তো ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে তাই আজ শপিংব্যাগ নিয়ে এসেছে কিন্তু তারপর থেকে প্রতিদিনই শপিংব্যাগ নিয়ে আসতো।
ক্লাশের টিচাররাও ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলো না। আমরা ক্লাশে হাসাহাসি করতাম ওর এইসব কাজ দেখে। শপিং ব্যাগ রেখে কোথাও যেত না। ওয়াসরুমে ধরলে ব্যাগ নিয়ে ওয়াসরুমে যায়।
একদিন আন্টিকে(তানভীরের মা) ডেকে আনা হলো। টিচাররুমের দেয়ালে কান রেখে আমরা শুনতেছিলাম ওর কাহিনীটা। শেষমেশ যা বুঝলাম তানভীরের আসলে শপিংব্যাগ প্রিয় বস্তু।
তানভীর ক্লাশের ফার্স্ট বয়।
ঐবার ফাইনাল পরীক্ষার আগে তানভীরের সাথে একটা ডিল করলাম।
“যদি তুই আমাকে দেখাস তাহলে আমি তোকে আরো ৫টা ভিন্ন ডিজাইনের শপিংব্যাগ এনে দিবো।”
কথাটা বলতেই তানভীর এর চোখ বড় হয়ে জ্বলজ্বল করতে লাগলো। যেই ছেলে ভুলেও পরীক্ষা হলো মাথা সরাতো না দেখানো তো দূরে, সে খুব সহজে এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
আমিও আমার কথা পালন করতাম। পরীক্ষা শেষে ওকে বাজার থেকে ৫টা শপিং ব্যাগ এনে দিতাম।
প্রতিটা পরীক্ষায় ও আমাকে দেখাতো আর আমি ওকে ৫টা করে শপিংব্যাগ এনে দিতাম।
সেইবার আমার রোল ২৮ থেকে ডাইরেক্ট ৩ এ চলে আসলো। আমার পরিবারের সবাই অবাক! কিভাবে এতো উন্নতি করলো দ্বীপরাজ?
আমি বললাম আমি দিনরাত পরিশ্রম করে লেখাপড়া করেছি! কিন্তু আসল কাহিনী তো করেছে শপিং ব্যাগ!
আস্তে আস্তে আমরা স্কুল পার করলাম। এসএসসি পরীক্ষায় এ+ ও পেলাম। সব শপিং ব্যাগ বাবাজীর ক্যারামতি। আমি খুঁজে খুঁজে তানভীরের জন্য সেরা শপিংব্যাগ নিয়ে আসতাম। দেখা গেলো ঢাকা বা বিদেশ থেকে এলাকায় কোন লোক এলেই আমি তাদের কাছ থেকে শপিং ব্যাগ জোগাড় করতাম আর তানভীরকে দিতাম।
তানভীরের ভার্সিটি জীবনের কাহিনী বলি, সেকেন্ড ইয়ারে থাকাকালীন এক মেয়ে ওকে প্রপোজ করে বসে। তানভীরও কিছু না ভেবে চিনতে “হ্যা” বলে দিলো।
ওদের প্রথম ডেট…
রেস্টুরেন্টের এক কোণায় দুজন চুপ করে বসে আছে। কিভাবে শুরু করবে কেউই বুঝতে পারছে না। অতঃপর মেয়েটা মুখ খুললো,
“তোমার জন্য একটা গিফট এনেছি। বাসায় গিয়ে খুলবে”
র্যাপিং করা একটা গিফট তানভীরকে দিলো।
তানভীরও জানতো প্রথম ডেটে গিফট দেওয়া লাগে। সেও র্যাপিং করা একটা জিনিস গিফট করলো মেয়েটাকে।
তানভীরও বললো, “বাসায় গিয়ে খুলবে…”, তানভীরের চোখে মুখে হাসির সাথে বিস্ময় মেশানো।
তানভীরের দেওয়া গিফটের প্যাকেটটা ছোট দেখে মেয়েটা ভেবেছিলো মনে হয় ডায়মন্ড রিং টাইপের কিছু হবে। আর না হলেও পায়ের নুপুরতো দিবেই। ভেতরে ভেতরে একটা বিরাট চিৎকারও দিয়ে বসলো যদিও বাহিরের কেউ শুনতে পেল না।
ডেট শেষে বাসায় গিয়ে তাড়াতাড়ি করে র্যাপিং কাগজ ছিঁড়ে ভেতরে কি আছে দেখার জন্য উদ্যত হলো। একটা ছোটবাক্সের ভেতরে একটা “শপিংব্যাগ”।
ঐরাতেই মেয়েটা তানভীরকে ফোন গিয়ে দুইটা গালি দিয়ে ব্রেকাপ করে নিলো। তানভীর বুঝতে পারছিলো না কেন করলো ব্রেকাপ। তানভীর তার সংগ্রহে থাকা অন্যতম সেরা একটা ব্যাগ মেয়েটাকে গিফট করেছিলো।
যাইহোক, হালকা মন খারাপ করে Time Zone থেকে দেওয়া শপিং ব্যাগটা তার শপিং ব্যাগের কালেকশনে যুক্ত করলো আর মনে মনে ধন্যবাদ জানালো মেয়েটা এতো সুন্দর একটা শপিং ব্যাগ গিফট করার জন্য। আর ঘড়িটা ওদের বাসার দায়োরানকে দিয়ে দিয়েছিলো…
ঝড় বৃষ্টির রাতে সবাই যখন ফেসবুকে পোস্ট দিতো “বউ চাই!” “বউয়ের হাতে খিচুরী খেতে চাই!” “এই বৃষ্টির দিনে একটা জামাই দরকার!” “ঘরের দরজা আটকানোর জন্যও হলেও একটা জামাই দরকার!”
অন্যদিকে তানভীর শপিংব্যাগকে সাথে নিয়ে ছবি দিত আর ক্যাপশনে লেখতো, “Sleeping with my horny shopping beg!”
…
…
…
এভাবেই কেটে গেল তানভীরের ভার্সিটি জীবন।
তানভীর এখন একটা শপিং ব্যাগ তৈরির কারখানায় চিফ ইঞ্জিনিয়ার। সে তার জীবন এবং ক্যারিয়ার নিয়ে বিশাল খুশি। সারাদিন শপিংব্যাগদের সাথে থাকতে পারছে, তাদেরকে ছুঁতে পারছে, কাছে রাখতে পারছে। আর কি লাগে জীবনে?
তানভীরের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। তানভীর একপ্রকার বিয়ে করতে অনিচ্ছুক তারপর পরিবারে উপর থেকে যেহুতু চাপ তাই বিয়ে করতেই হচ্ছে।
ভালোয় ভালোয় বিয়ে হয়ে গেল তানভীরের। আজ ওর বাসর রাত।
আনুষ্ঠানিকতা সেরে দরজা লাগিয়ে দিল। রুমের মধ্যে এখন শুধু তানভীর ও তার স্ত্রী জেরিন। আস্তে আস্তে পায়ের পাতা ফেলে খাটের কাছে আসছে তানভীর। জেরিন লজ্জায় তার ঘোমটা নামিয়ে নিল। জেরিনের মিটিমিটি হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে তানভীর।
চারিপাশে যেন ভালোবাসায় স্নিদ্ধ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। পাশে রাখা ফুলদানী থেকে রজনীগন্ধ্যা মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে।
আস্তে আস্তে খাটের উপর বসলো তানভীর। মুখে প্রাপ্তির হাসি। বসা অবস্থায় হাতের উপর ভর দিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল জেরিনের দিকে। দুজনের মনের মধ্যে প্রবল আবেগের ঢেউ খেলা করছে। তানভীর আস্তে করে জেরিনের ঘোমটা নামিয়ে দিলে। মুখ তুলে একবার চোখের দেখা দিয়ে আবারো চোখ নামিয়ে নিল জেরিন। দুজনেই হৃস্পদন তুঙ্গে!
আস্তে করে জেরিনের পেছনে হাত নিয়ে গেল তানভীর। হাত চলে গেল বিছানার তোষোকের নিচে। শব্দহীন ঘরে কড়কড় শব্দের কিছু একটা তোষকের নিচ থেকে টেনে বের করে আনার শব্দ শোনা গেল। লজ্জা লাল হয়ে গেল জেরিন। চোখ দ্রুত নিচে নামিয়ে নিল।
কয়েকসেকেন্ড পর হালকা করে চোখ উঠাতেই দেখতে পেল দাত বের করে হাসি মুখে তাকিয়ে আছে তানভীর। হাতে একটা বড়সাইজের প্রিমিয়াম কোয়ালিটির “শপিংব্যাগ”!
১ সপ্তাহ পরে কোন এক অদ্ভুদ কারণে তানভীরের ডিভোর্স হয়ে গেল। যদিও সে এতে একপ্রকার খুশি। তার বিছানায় এখন শপিংব্যাগ আর সে খুব আরামে ঘুমাতে পারে। জেরিন থাকলে ৩জন চাপাচাপি করে ঘুমাতে সমস্যা হতো…!